২০১৬ সালের কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় সবে পা রাখলেন মাহমুদুল হাসান। পরিবারের অবস্থা যথেষ্ট সচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও অনেকদিন ধরেই নিজের খরচ নিজে চালানোর একটা তীব্র ইচ্ছা ছিল মাহমুদুলের, বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঠার পর ইচ্ছেটা আরো পোক্ত হলো।

কিন্তু এদেশের অগণিত বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা যে পথে পা বাড়ায়, সেরকম ভাবে টিউশনি করে টাকা উপার্জন করাটা একদমই পছন্দ ছিল না মাহমুদুলের। খণ্ডকালীন চাকরির কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু ক্লাসের ফাঁকে সুযোগ হচ্ছিলো না।

এর মাঝে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের তিন মাস কেটে গেলো, শুরু হলো আন্তঃডিপার্টমেন্ট ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। স্কুল জীবন থেকেই এডোবি ইলাস্ট্রেটর আর ফটোশপের কাজে অভ্যস্ত মাহমুদুল ডিপার্টমেন্টের জন্য একটা জার্সির ডিজাইন করে দিলেন, খেলার মাঠে আর সব জার্সির মাঝে এই জার্সিটা সবার বেশ নজরও কাড়লো। নজর কাড়াটাই স্বাভাবিক, অন্যান্য ডিপার্টমেন্ট যেখানে সস্তায় কাজ চালানোর মতো একটা জার্সি নিয়ে মাঠে নামলো, সেখানে মাহমুদুলের ডিজাইনটা ছিল অনেক বেশি মানসম্মত।

এর কয়েকদিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্কেটবল টুর্নামেন্টে তিন-তিনটি ডিপার্টমেন্ট নিজেদের জার্সির জন্য ডিজাইন চেয়ে বসলো মাহমুদুলের কাছে। সেবারই প্রথম জার্সি ডিজাইন করে উপার্জন করা হলো মাহমুদুল হাসানের, এবং সেই থেকেই শুরু।

জার্সি ডিজাইন এবং বানানোর কাজ করতে গিয়ে কয়েকটি গার্মেন্টসের সাথে বেশ পরিচয় হয়ে গিয়েছিল মাহমুদুলের, সেই সূত্রে জার্সি বানানোর সকল কাজ তিনি নিজেই করে দিতে লাগলেন। একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ জার্সির অর্ডার আর ডিজাইন পছন্দ করে দিলেই হলো, বাকি সব দায়িত্বই ছিল মাহমুদুলের। কিন্তু প্রথমদিকে এই থেকে বেশ টাকা আসলেও, নিজের সমস্ত খরচ নিজে চালানোর জন্য তা পর্যাপ্ত ছিল না। মাহমুদুল তাই এবার ভাবলেন নিজের একটি প্রতিষ্ঠানের কথা।

নিজস্ব একটি লোগো, ওয়েবসাইট এবং ফেসবুক পেজ সম্বল করে নিজের শোবার ঘরেই অলিখিত অফিস খুলে বসলেন মাহমুদুল হাসান। এতোদিন শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের কাজগুলোই করেছেন, এবার অনলাইনে বেশ জোরালোভাবে প্রচারণা চালাতে লাগলেন। যেহেতু যুগটাই ফেসবুকের, তাই বিনে পয়সায় মাহমুদুলের বিজ্ঞাপনও খুব হচ্ছিলো। বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের জন্য করে দেওয়া জার্সির ডিজাইনগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখে বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মাহমুদুলের সাথে যোগাযোগ করতে লাগলো, এমনকী বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের কাছেও মাহমুদুলের ডিজাইনের বেশ চাহিদা তৈরী হলো। মাঝে মাঝেই অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন ডিজাইন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্টার প্রদর্শনী ক্যাম্পেইনগুলোর মাধ্যমে নিজস্ব বিজ্ঞাপনের একটা বিকল্প ব্যবস্থা করে ফেলেছিলেন তিনি, এবং সেই সূত্র ধরেই মাত্র এক বছরের মাথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষেই সম্পূর্ণভাবে নিজের খরচ চালানোর মতো সামর্থ্য হয়ে গেলো মাহমুদুল হাসানের।

এরকম অসংখ্য মাহমুদুল হাসান নিজেদের শখ এবং আগ্রহকে উপজীব্য করে জীবিকার সংস্থান করছেন, নিজেদেরকে তুলে ধরছেন অনলাইনে, পাচ্ছেন গ্রহণযোগ্যতা। তরুণ উদ্যোক্তা, যারা পুঁজির অভাবের কথা বলে মাথা কুটে মরেন, তাদের জন্য দৃষ্টান্ত হতে পারেন এই মাহমুদুলেরা। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামকে যেখানে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রেই, সেখানে এই অনলাইনভিত্তিক মাধ্যমগুলোই অনেক সময় খুলে দিচ্ছে সম্ভাবনার আগল।

নামী-দামী প্রতিষ্ঠানগুলোও অনলাইনের গ্রহণযোগ্যতার কথা মাথায় রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার ক্ষেত্রে বেশ জোর দিচ্ছেন, তার উদাহরণ আমাদের চোখের সামনেই।

যারা তরুণ, তাদের জন্য অনলাইনভিত্তিক প্রচারণা হচ্ছে নিজেদেরকে তুলে ধরার একটি সুবর্ণ সুযোগ। নিজেদের ব্যতিক্রমী ভাবনাগুলো অল্প সময়ে অসংখ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার এরকম সুযোগ আর নেই, তাই আমাদের উচিৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সংক্রান্ত বিভ্রান্তি থেকে বেরিয়ে এসে এর সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা।

অনলাইনের মাধ্যমে সফলতার দুয়ার খুলে যাক সকল তরুণ উদ্যোক্তার- এবং এটাই হোক ডিজিটাল বাংলাদেশের পরিবর্তন প্রত্যাশী নাগরিকদের অন্যতম লক্ষ্য।

সৌরভ শাহরিয়ার, লেখক, উই আওয়ার্স সিনেমা।